ধোনির থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে, বলছেন হাবিবুল বাশার…

২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রথম বার সাক্ষী হয়েছিল মহেন্দ্র সিংহ ধোনির। ডিসেম্বরের চট্টগ্রামে সে ম্যাচে বিপক্ষে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের মনে এখনও টাটকা সেই সময়ের ধোনি। ৫০ টেস্ট ও ১১১ ওয়ানডে খেলা পদ্মাপারের প্রাক্তন ক্রিকেটার অকপট থাকলেন আনন্দবাজার ডিজিটালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। যাতে ধরা পড়ল সীমান্তের ওপারের ধোনি-মুগ্ধতার সৌরভ।

বাংলাদেশের এক জন প্রাক্তন অধিনায়ক হিসাবেই শুধু নয়, আপনার সঙ্গে ধোনির সম্পর্ক অনেক গভীর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধোনির অভিষেক ঘটেছিল আপনার দলের বিরুদ্ধে। ২০০৪ থেকে ২০২০। লম্বা সময়। ধোনির ক্রিকেট সফর কী ভাবে দেখছেন?

হাবিবুল বাশার: প্রথমেই ফিনিশার ধোনির কথা বলতে হয়। এমন ফিনিশার খুব কম এসেছে ক্রিকেটে। হয়তো আগামী দিনেও কম আসবে। এক জন ক্যাপ্টেন হিসেবেও ওর মতো কাউকে পাওয়া মুশকিল। অধিনায়ককে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করার জন্য পারফর্ম করা জরুরি। সেটা ও করেছে। সবচেয়ে ভাল দিক হল, ওর মনের মধ্যে কী রয়েছে, তা ও কিছুতেই বুঝতে দিত না। কেউ বুঝতে পারত না ও কী ভাবছে। দেখুন, ক্যাপ্টেন যদি টেনশনে পড়ে যায়, উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তবে তা সংক্রামিত হয় দলের মধ্যে। আমি নিশ্চিত, ধোনিরও নির্ঘাত টেনশন হত। এক জন ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি এটা বুঝতে পারি। কিন্তু তা কখনও দেখাত না। সব সময় ওকে একই রকম দেখাত। যা বিশাল বড় গুণ। ওর মাথাটা খুব ঠান্ডা। ফলে, সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হত। রিভিউ সিস্টেমের কথাই বলুন না। ওর মতো পারফেক্ট রিভিউ খুব কম উইকেটকিপারই নিতে পারে। কারণ, ওর মাথাটা একেবারে ঠান্ডা। যার ফলে সিদ্ধান্তে ভুল হত না। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ওর কাছে থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

কী কী শেখার রয়েছে?

হাবিবুল বাশার: অনেক কিছু। এক জন তরুণ ক্রিকেটার যেমন শিখতে পারে, তেমনই সিনিয়ররাও পারে ওকে দেখে, অনুকরণ করে। ভারতের মতো দলকে সামলানো সহজ নয়। যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও মুহূর্তে ও সিনিয়র-জুনিয়রদের একসঙ্গে সামলেছে। একটা দলকে কী করে গড়ে তুলতে হয়, সেই নিরিখে ও দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে যাবে। আর সেটা সবার কাছেই থাকবে। ও গ্রেট পার্সন, গ্রেট ক্রিকেটার। এখন ওর অবসর নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় অবসর নিয়ে না ভেবে ওর সামগ্রিক কেরিয়ারের দিকে তাকানো উচিত। আর তা হলেই পরিষ্কার হবে যে ধোনির থেকে সবারই অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

এখনকার বাংলাদেশ দলের মধ্যে ধোনির কোন বৈশিষ্ট দেখতে চাইছেন? সোজা কথায়, ধোনির কোন গুণগুলো এই দলের দরকার?

হাবিবুল বাশার: ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট সব সময় চাপের খেলা। ওঠা-পড়া থাকে। চলতেই থাকে। এটাকে মেনে নিয়ে এই চাপ কী ভাবে সামলাতে হয়, সেটা ধোনির থেকে নেওয়া যেতে পারে। আমাদের টিমে যেমন সাফল্য-ব্যর্থতা লেগেই থাকে। ওঠা-পড়া অনেক বেশি। পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। কিন্তু, সফল হওয়ার জন্য মারাত্মক চাপ থাকে আমাদের দলের উপর।

প্রত্যাশার চাপ যাকে বলা হয়।

হাবিবুল বাশার: হ্যাঁ। সেটাই বলছি। প্রচুর প্রত্যাশা। আর এখানে ক্রিকেট ফ্যানও অজস্র। কী ভাবে চাপ সঙ্গে করে নিয়ে সেরা খেলাটা মেলে ধরতে হয়, এটা ধোনির খেকে শেখার রয়েছে। ও তো এই কাজটাই দিনের পর দিন করে এসেছে। শুরুর দিকে ধোনির কেরিয়ারও চাপে ছিল। এবং ওর শুরুটা কিন্তু দারুণ কিছু ছিল না। সেই সময় কাটিয়ে যে ভাবে নিজের সেরাটা তুলে ধরেছে, সেটা রীতিমতো প্রশংসার। সেটাও শিক্ষণীয়।

শুরুর সেই দিনে আসি। আপনি তখন বাংলাদেশের অধিনায়ক। ভারতের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজের আগে ধোনি সম্পর্কে কী জানতেন?

হাবিবুল বাশার: শুনেছিলাম, ইন্ডিয়া এক জন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানকে নিয়ে আসছে। যে খুব হার্ড-হিটার। অ্যানালিস্ট সেটাই বলেছিল। ওর বিরুদ্ধে খেলার খুব একটা স্মৃতি নেই। তবে ওই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ধোনির ক্যাচটা আমিই ধরেছিলাম। সেই ম্যাচ আমরা জিতেওছিলাম।

তখন ধোনির বিরুদ্ধে গেমপ্ল্যান কী থাকত?

হাবিবুল বাশার: আমরা যখন ধোনির বিরুদ্ধে গেমপ্ল্যান করছিলাম শুরুর দিনগুলোয়, তখন অ্যানালিস্ট একটা কথাই বলত, হি ইজ আ গেম-চেঞ্জার। ওকে আটকে রাখতে হবে। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো জায়গায় ওকে পৌঁছতেই দেওয়া যাবে না। ফ্রি খেলার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ, ফ্রি খেলতে শুরু করলে ম্যাচ বের করে নিয়ে যাবে। অ্যানালিস্ট বলত, ও হার্ড হিটিং ব্যাটসম্যান। এটা নিয়েই বেশি চর্চা হত। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে হওয়া ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত মোটামুটি এটাই টিম মিটিংয়ে ধোনিকে নিয়ে কথা হত। ক্রিজে থিতু হতে দেওয়া যাবে না, এটাই পরিকল্পনা থাকত ধোনির বিরুদ্ধে।

নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হত যে এই জায়গায় বল করা নিষিদ্ধ?

হাবিবুল বাশার: বোলারদর একেবারে কোন লাইন-লেংথে বল করতে হবে বলা থাকত, তা এখন মনে পড়ছে না। অনেক দিন আগের কথা। তবে বলা থাকত যে ধোনিকে হাত খুলতে দেওয়া যাবে না। ওর যেটা শক্তির জায়গা, সেখানে বল দেওয়া চলবে না। মুশকিল হল, ধোনি স্ট্রং অনেক জায়গায়। কোনও কোনও ব্যাটসম্যান থাকে যে অফে বেশি স্বচ্ছন্দ বা অনে মারতে বেশি ভালবাসে। কিন্তু, ধোনি কোনও একটা জায়গায় শক্তিশালী নয়। সব দিকে মেরে খেলতে পারে। ব্যাকফুটে যেমন, ফ্রন্টফুটেও তাই। পেস বল ভাল খেলতে পারে, স্পিনও তাই। এমন ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে একটা সহজ থিওরি মেনে চলা হয়। অফ স্টাম্প লাইনে বল করে, শট নেওয়ার জায়গা না দেওয়া। বেশি উপরে বল না করা। শর্ট বল না দেওয়া। ক্ল্যাসিক ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে যা করা হয় আর কী। লং অন, লং অফ রেখে আউটসাইড অফ স্টাম্প বল করে যাওয়া। থ্রি-কোয়ার্টার লেংথ রাখা। ধোনির ক্ষেত্রেও বোলারদের বলা থাকত যে, মারার জায়গা দেওয়া চলবে না। দ্রুত ফেরাতে পারলে তো খুব ভাল, কিন্তু তা না হলেও ছন্দে খেলতে দেওয়া যাবে না।

কিন্তু ধোনিকে তো ঠিক ক্ল্যাসিক ব্যাটসম্যান বলা যায় না। নিজস্ব একটা ভঙ্গি ছিল। হেলিকপ্টার শট যেমন। সেই ধোনিই পরবর্তীকালে ফিনিশার হয়ে উঠলেন।

হাবিবুল বাশার: আমার মতে, ধোনি এক জন প্লেয়ার হিসেবে, পার্সন হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়েছে বলুন বা বেশি নিজেকে মেলে ধরাই বলুন, সবটাই ঘটেছে অধিনায়ক হওয়ার পর। তার আগেও প্লেয়ার হিসেবে ভাল ছিল। সব সময়ই ভাল ছিল। কিন্তু, অন্য উচ্চতায় ওঠার ব্যাপারটা ঘটে নেতৃত্বে এসে।

ব্যাটসম্যান হিসেবে ধোনির বদলকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

হাবিবুল বাশার: এক জন ভাল খেলোয়াড় আর এক জন গ্রেট খেলোয়াড়ের পার্থক্যের কথা বলতে হচ্ছে এখানে। এক জন ভাল খেলোয়াড় নিজের খেলাটাই খেলে চলে। আর এক জন গ্রেট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের খেলায় উন্নতি করে। ধোনি যখন এসেছিল তখন ওর কাজ ছিল চার-ছয় মাপা। ইনিংস তৈরির দায়িত্ব ছিল না। সেটাতেও দারুণ সফল হয়েছিল। এর পরে অন্য দায়িত্ব আসে ওর উপর। তাতেও দুর্দান্ত সফল। তার কারণ, ও জানত যে হাতে বড় শট নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে ওর। দশ-বিশ রান যে কোনও সময় পুষিয়ে নিতে পারবে, সেই কনফিডেন্স ছিল আগাগোড়া। ফলে, পরের দিকে একটু সময় নিয়ে খেলেছে। অপেক্ষা করে ম্যাচকে নিয়ে যেত শেষ পর্যন্ত। এটাই গ্রেটনেসের লক্ষণ।

হাবিবুল বাশার: কঠিন তো বটেই। মুশকিল হল, আর সব কিছু শেখানো যায়, এটা শেখানো যায় না। কোচিং ম্যানুয়ালেও এটা পাবেন না। এটা কোনও ক্রিকেটারের মধ্যে থাকতে হয়। কোচরা বড় জোর বলে দিতে পারে যে ওই পরিস্থিতিতে এ ভাবে খেলতে হয়, মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। কিন্তু এটা ভিতরে না থাকলে ওই পরিস্থিতিতে মেলে ধরা যায় না। এখানেই বাকিদের থেকে ধোনির তফাত।

একটা অপ্রিয় প্রসঙ্গে আসছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ধোনি যেমন আদরের, তেমনই কখনও কখনও ধিক্কৃত এক চরিত্রও। মুস্তাফিজুরের কাটারে মাথা অর্ধেক ন্যাড়া হওয়ার ছবি, তাসকিনের হাতে ধোনির কাটা মুন্ডুর ছবি যেমন। এটা কতটা অক্রিকেটীয়?

হাবিবুল বাশার: সত্যি বলতে এটা নিয়ে আমরাও লজ্জিত। ধোনির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কিন্তু দারুণ সম্পর্ক। ও মানুষ হিসেবেও দারুণ। ধোনি কিন্তু এমন নয় যে মাঠে স্লেজ করবে, উল্টোপাল্টা মন্তব্য করবে। ও কখনও অন্য দলের সম্পর্কে খারাপ কথাও বলে না। মাঠে বা মাঠের বাইরে কখনও দেখিনি কাউকে অসম্মান করেছে। কখনও বিপক্ষ নিয়ে শ্রদ্ধার অভাব দেখা যায়নি। এই যে কাণ্ডগুলোর কথা আপনি বললেন, সেগুলো কিছু বোকা লোকের কাজ। যারা ক্রিকেট কখনও দেখেনি, বোঝেও না। তাদের নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটমহলে ধোনির প্রতি বরং একটা শ্রদ্ধাই রয়েছে। এটা যাঁরা ক্রিকেট খেলার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা সবাই জানে।

হাবিবুল বাশার: অবসরের সঠিক সময় বলে কিছু নেই। এটা যাঁর যাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। সঠিক সময়ে অবসর নিয়ে বাহবা পেলাম, এমন ভাবনার কোনও মানে হয় না। আগেকার আমলে শুধু দেশের হয়ে খেলা ছিল। এখন দেশের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নিয়ে খেলার ব্যাপারও থাকে। জাতীয় দল থেকে অবসর নিলে খেলার ইচ্ছা বা চ্যালেঞ্জের দিকটা অনেক কমে যায়। তখন খেলা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। আমার মনে হয়েছে যে ধোনি খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল, তাই আগে অবসর নেয়নি। আমি বরং পজিটিভ দিকে দেখব যে, এই বয়সে এসেও ও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহস দেখিয়েছিল। যত দিন খেলতে চেয়েছিল, ও এ ভাবেই খেলতে চেয়েছিল। আর ধোনির মতো ক্রিকেটারের অবসর নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে ওর কেরিয়ার থেকে ফোকাস সরে যাওয়া। সেটা না করাই উচিত। ক্রিকেটার হিসেবে ওর যা অবদান, ক্রিকেটের প্রতি ওর যা অবদান, শুধু ভারতীয় ক্রিকেটের ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক ভাবেও, সেটা মনে রাখা উচিত।

আপনি বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে টস করতে গিয়েছেন। ওই দুই অধিনায়কের থেকে ধোনি কতটা আলাদা বা কেন আলাদা? বা, অধিনায়ক হিসেবে ধোনি স্থান ঠিক কোথায়?

হাবিবুল বাশার: একেক সময় একেক জন ক্যাপ্টেন এসেছে। তখনকার পরিস্থিতি বলুন বা টিম, সবই আলাদা। আমি তুলনা পছন্দ করি না। সৌরভ যে দল পেয়েছিল, যে পরিস্থিতি ছিল, তা সবটাই আলাদা পরের থেকে। ধোনিও পেয়েছে অন্য ধরনের দল। এখন বিরাট কোহালিও অন্য দল পেয়েছে। ধোনি নিশ্চিত ভাবেই সেরা ক্যাপ্টেনদের তালিকায় থাকবে। টপেই থাকবে। তবে অন্যদের সঙ্গেই থাকবে। কারণ, সৌরভের অবদানের কথাও ভুললে চলবে না। কেউ এক নম্বর, কেউ দুই নম্বর, সে ভাবে আমি বাছব না। সৌরভের লিগ্যাসি বহন করেছে ধোনি। এখন কোহালিও তা বইছে। এরা সবাই ভাল অধিনায়ক।

Reply