ভারতীয় নাগরিক হওয়ার চেয়ে বাংলাদেশে উইপোকা হয়ে বেঁচে থাকা ভালো

ভারতীয় অর্থনীতি এখন ক্ষয়িষ্ণু প্রবণতায় ভুগছে। এই অবস্থার মধ্য দিয়েই গত বছরের শেষ নাগাদ বার্ষিক উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। অর্থনীতির এমন বিপর্যয়ে জনতার নজর নিজেদের ব্যর্থতা থেকে দূরে সরাতেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নতুন কৌশল ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশের হুজুগ তুলেছে বিজেপিসহ হিন্দুত্ববাদী বেশ কিছু রাজনৈতিক দল।

এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা এবং সেই তুলনায় ভারতের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন দেশটির বিখ্যাত লেখক ও বর্ষীয়ান সাংবাদিক করণ থাপার। তার ওই মতামত ভিত্তিক কলাম প্রকাশ করে দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস। করণ থাপারের জবানিতে বাংলাদেশের উন্নতি ও ভারতের এক শীর্ষ মন্ত্রীর মিথ্যাচারের বর্ণনার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

সত্যি বলতে কি, আজকের এই পরিস্থিতির জন্য আমি অভিযোগের আঙুল প্রথমে হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতি তুলতে চাই। ১৯৭০ এর দশকে এই মার্কিন কূটনীতিবিদ বাংলাদেশকে একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ ভিক্ষাকারী তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উল্লেখ করেন। যুদ্ধ পরবর্তী ওই সময়ে, অবশ্য বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমনটাই ছিল। সে সময়ের টেলিভিশন সংবাদে বাংলাদেশে বন্যা দুর্গত অঞ্চলের ছবিও ছিল নিত্য-নৈমেত্তিক ঘটনা। তাই কিসিঞ্জারের সংজ্ঞা সে যাত্রা টিকে গেল।

আজকের বাংলাদেশ অবশ্য ভিন্ন এক দেশ। বাংলাদেশের ব্যাপারে পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে সময় লাগলেও, আমি অন্তত এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত। আর আমার মতো ভারতবাসীরও বাংলাদেশ নিয়ে সেই ৭০’এর দশকের আদ্যিকালের ধারণা রাখা উচিত নয়। অথচ গত সপ্তাহে আমাদের উপস্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জি কে রেড্ডি সেই কাজটাই করেছেন।

নিজের বর্ণবাদী মনোভাব চেপে না রেখেই এই মন্ত্রী বলেছেন, নাগরিকত্ব দিলে নাকি অর্ধেক বাংলাদেশের মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসবেন।

এই বক্তব্য শুধু প্রচলিত কূটনৈতিক শালীনতা লঙ্ঘন তাই নয়, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের সকল মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয় বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে যে কিছুই জানেন না এটা তার বক্তব্যেই স্পষ্ট। নাহলে কি আর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তুলনা দেয়া চলে। অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তুলনা দেয়া পরিহাসেরই নামান্তর।

বাংলাদেশ আজ জীবনমান আর মানব উন্নয়ন সূচকের সব কয়টিতেই ভারতের চাইতে অনেক ভালো অবস্থানে। খোলা চোখে তাকালে প্রথমেই নজরে আসে বাংলাদেশের বিপুল মোট উৎপাদন প্রবৃদ্ধি, যা এখন ঈর্ষণীয় ৮ শতাংশের ঘরে। আর ভারত তার প্রবৃদ্ধি বিজেপির শাসনামলেই ৫ শতাংশে নেমে আসতে দেখেছে।

ভারতে এখন স্তিমিত হয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের চাপে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন প্রকৃত বাণিজ্যিক করের আওতা নামিয়ে আনছেন ১৫ শতাংশে। বিনিয়োগ নিয়ে আমাদের অবস্থা টালমাটাল হলেও, বাংলাদেশ কিন্তু বিনিয়োগ প্রবাহ ধরে রেখেছে।

আপনি লন্ডনে যান কি নিউইয়র্কে, সেখানের হাই স্ট্রিটগুলোতে আপনি বাংলাদেশে তৈরি পোশাক দেখতে পাবেন। সেই তুলনায় লুধিয়ানা বা ত্রিপুরায় উৎপাদিত (ভারতীয়) পোশাক খুব একটা চোখে পড়ে কি? আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ডাবল ডিজিট আকারে বেড়েছে। একই সময়ে রপ্তানি বাজারে ভারত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।

তবে শুধু অর্থনীতির উদাহরণ দিলেই তো একটি দেশ সম্পর্কে সব বলা যায় না। মানব উন্নয়ন প্রকৃত উন্নতির প্রধান শর্ত। সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশিদের নারী ও পুরুষদের গড় আয়ু এখন যথাক্রমে ৭৪ এবং ৭১ বছর। ভারতে যা মাত্র ৭০ এবং ৬৭ বছর।

এক মাসের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ভারতে প্রতি হাজারে ২২ দশমিক ৭৩টি। বাংলাদেশে যা মাত্র ১৭ দশমিক ১২টি। এক বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহারেও ভারত এগিয়ে। ভারতে এই হার প্রতি হাজারে ২৯ দশমিক ১৪ এবং বাংলাদেশে ২৫ দশমিক ১৪। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুতে ভারতীয় সংখ্যা ৩৮ দশমিক ৬৯ আর বাংলাদেশে ৩০ দশমিক ১৬।

এসব কিছুর পরেও আমাদের মন্ত্রী মহোদয় বলছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতীয় নাগরিকত্ব দিলে খালি হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান আরও অসংখ্য আছে। নারী শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা ইত্যাদি দিক থেকে উন্নতিতে বাংলাদেশ আজ বহু যোজন সামনে।

তাইতো দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছেন, ভারতের অনেক নাগরিক এখন বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন। একথার সত্যতা সব ভারতীয়কে অনুধাবন করতে হবে।

বিজেপি পাণ্ডাদের প্রিয় গরু খেতে কোনো বাংলাদেশি ভারতে আসে না, বরং ভারতীয়রাই সেদেশে যায়। কারণ তারা জানেন, ভারতে বৈধ নাগরিক হলেও জীবনের কোনো মূল্য নেই। তার চাইতে বরং বাংলাদেশে অবৈধ উইপোকা হয়েই বেঁচে থাকা ভালো।

Reply