ভারতের কাছে বাংলাদেশ কী চায়?

তিনটি গল্প দিয়ে শুরু করি: “আরে প্রশান্ত, কতদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা! তোমার বউদি সবসময় তোমার কথা বলে! একদিন অবশ্যই আমাদের বাসায় আসবে। বল, কবে আসবে?”

বলতে বলতে দাদা এক লাফে বাসের পাদানিতে উঠে পড়েন হ্যান্ডেল ধরে: “দাদা ঠিকানাটা?”

প্রশান্তের দিকে না তাকিয়েই দাদা হাত তুলে জবাব দেয়: “সে হবেখন!”

২. প্যারিসে যখন ছাত্র ছিলাম, তখন আমাদের এক বন্ধু কারণে-অকারণে অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিত। টাকা ফেরত চাইলে, বিছানায় শুয়ে, হাঁটুর উপর আরেক পা দিয়ে, এক গাল হেসে নেতাদের মতো হাত তুলে বলত: “দিমুনে!”

৩. যুদ্ধে হেরে যাওয়া এক সেনাপতি রাজার কাছে জবাবদিহি করতে গিয়ে বলেছিল: “পরাজয়ের হাজারটা কারণ আছে, যেমন ধরুন, বৃষ্টিতে আমাদের বারুদ ভিজে গিয়েছিল।”

রাজা উত্তর দিয়েছিলেন, বাকি নয়শ নিরানব্বইটা কারণ আর জানতে চাই না।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, তিস্তার মতো নদীমাতার শীর্ণকায় শরীর দেখে কোনো সন্তানের কি খুশি হওয়ার উপায় আছে? বাঙালিরা সেই কবে থেকে ভারতের কাছে নদীর জলের ন্যায্য হিস্যা দাবি করে আসছে। ভারতের সার্বক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: “দিমুনে” বা “সে হবেখন”।

কখনও মমতার দোহাই, সুষমার কথার মারপ্যাঁচ, কখনও স্রেফ গড়িমসি। তৃতীয় আওয়ামী শাসনামলে ঋণসহায়তা, প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ, মহাকাশ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়দানের জন্যে বাংলাদেশের জনগণের বৃহদাংশ আগে থেকেই ভারতের জনগণের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। ভারত বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিয়েছে, এখনও দিচ্ছে, কিন্তু নিজের মা-ই যদি না বাঁচে, তবে বাকি নয়শ নিরানব্বইটা ‘মাই’ দিলেও দুগ্ধপোষ্য শিশুর কান্না থামে না।

বাংলাদেশও কম দেয়নি ভারতকে। “আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি!”

বাংলাদেশের কাছে দাবি করে পায়নি এমন কিছুই হয়তো আর অবশিষ্ট নেই ভারতের চাহিদার তালিকায়, বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশ যা চায়, ভারতের সবই দিয়ে দেওয়া উচিত, বিনা প্রশ্নে। আমরা বাঙালিরা জানি, ভারত আমাদের মামার বাড়ি নয়, সুতরাং অন্যায় কোনো আবদার আমরা করি না, ন্যায্য দাবি করি। ইমানদার প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরও উচিত, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য-ঘাটতি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া। ভারতের হাবিজাবি সব চ্যানেল বাংলাদেশের লোক দেখে। বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো কেন ভারতে দেখানো যায় না?

বাংলাদেশের কাছে দাবি করে পায়নি এমন কিছুই হয়তো আর অবশিষ্ট নেই ভারতের চাহিদার তালিকায়, বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলে

আমরা যদি একে অপরকে জানতেই না পারি, তবে মৈত্রী সম্ভব হবে কেমন করে?

বাংলাদেশ ভারতের বইয়ে ছয়লাব। বাংলাদেশের বই কি ভারতে অতটা সহজলভ্য? বাংলাদেশ ও ভারতের নীতিনির্ধারকেরা কবে দুই দেশের মধ্যে ভিসা তুলে দেওয়ার মতো শিক্ষিত ও সভ্য হবেন? জার্মান আর ফরাসিরা যদি হাজার বছরের শত্রুতা ভুলে বিনা ভিসায় একে অপরের দেশে আসা-যাওয়া করতে পারে, তবে আজন্ম মিত্র বাঙালি ও ভারতীয়রা কেন তা পারে না? নিছক আমলাতান্ত্রিক আবদারের কারণে ভিসা যদি রাখতেই হয়, তবে উভয় দেশেরই ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজতম করার বিকল্প নেই।

‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না!’ গঙ্গার পানির আশা ছেড়ে পদ্মার চরের বালিতে তরমুজ ফলিয়ে খুশি থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সিকিম থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে তিস্তা নদী। সিকিম নাকি তিস্তা নদীতে একাধিক বাঁধ দিয়েছে। চীনও নাকি বাঁধ দিয়েছে ব্রহ্মপুত্রে। ভারত বাঁধ দিয়েছে গঙ্গা আর তিস্তায়।

আচ্ছা এই নদীগুলো কি সিকিম, ভারত বা চীনের বাবার সম্পত্তি? নদীগুলো কি বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে সাগরে পড়েনি? নদীবিষয়ক যে আন্তর্জাতিক আইন আছে, তাতে কি বাঁধ দেওয়ার আগে সব শরিক দেশের সঙ্গে আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি? ভারত বা চীন দেখাক তো বাংলাদেশ জ্ঞাতসারে কোনো একটি আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করেছে!

মমতা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গেই তিস্তা নদীতে জল নেই। দিদিভাইয়ের কথা হয়তো সত্য, কারণ ভারতের বেশির ভাগ নদীতে আমি নিজেই ‘হাঁটুজল’ দেখেছি। উত্তর ও মধ্য ভারতের নদীগুলোর জলক্ষীণতা আজকের সমস্যা নয়। সেই ত্রিশের দশকের শেষ দিকে মুজতবা আলী কাবুল যাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন:

“শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, বিতস্তা… গাড়ি থেকে তাকিয়ে দেখে বিশ্বাস হয় না… কোথায় তরঙ্গ আর কোথায় তীরের মতো স্রোত! এপাড় ওপাড় জুড়ে শুকনো খাঁ খাঁ বালুচর, জল যে কোথায় তার পাত্তাই নেই, দেখতে হলে মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ দুইয়েরই প্রয়োজন।”

বছর চল্লিশেক পরে এইসব মরা নদীর উপর খাড়ার ঘায়ের মতো দেওয়া হয়েছে একের পর এক বাঁধ। নদীতে বাঁধ দেওয়া অন্যতম জাতীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন পঞ্চাশ-ষাটের দশকের অবিমৃশ্যকারী নীতিনির্ধারকেরা, উপমহাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র। গঙ্গা বা তিস্তার মতো যে নদীগুলো তখনও জীবন্ত ছিল অচিরে সেগুলোকেও মারার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। নদীশাসনের কারণে জলক্ষীণতা, মৎস্যহীনতা, মরুকরণসহ বিবিধ পরিবেশ বিপর্যয়ের ফল ভোগ করছি আমরা দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তি প্রজন্ম। ‘পণ্ডিত’ নেহেরু একবার বলেছিলেন:

“বাঁধগুলো হচ্ছে আমাদের নতুন দেবতা!”

মহিশুরে মৃতপ্রায় কাবেরী নদীর চরে কাবেরী দেবীর পাথরের মূর্তি দেখেছি বটে। নদীকে হত্যা করে নদীর পূজা। জুতা মেরে গরুদান। না ভুল বললাম, পানির মতো গরুর সরবরাহও বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর ভারতের মৌলবাদীরা। ওরা আমাদের গরুতে মারবে, পানিতে মারবে।

ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশের জনগণের একটি অংশ ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিদ্বেষী। ভারতের বিরোধিতা এবং হিন্দুবিদ্বেষ অঙ্গাঙ্গী জড়িত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা কিয়দংশে হলেও ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আচরণ এবং ভারতের ঘটনাপ্রবাহের উপর নির্ভর করে।

একাত্তর সনে এক পত্রিকার শিরোনাম ছিল: ‘ইয়াহিয়ার এক বুলি, এক মিনিটে তিন গুলি। প্রথম গুলি হিন্দু, দ্বিতীয় গুলি আওয়ামী লীগ কর্মী, তৃতীয় গুলি আওয়ামী লীগ সমর্থক।’

ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় হিন্দুরা ছিল হানাদার বাহিনীর প্রধান শত্রু। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা হলে বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির আক্রান্ত হয়েছিল, নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছিল, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সত্তরের নির্বাচনে প্রায় ত্রিশ শতাংশ ভোটার আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল বা এখনও দেয় তাদের মধ্যেও যে হিন্দু ও ভারতবিদ্বেষী ছিল না বা নেই, এমন নয়। অতীতের বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা এখনও অনেকে বেঁচে আছে, বহাল তবিয়েতে আছে তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত অনুসারী আর উত্তরাধিকারীরাও। ভারতীয় জনগণের একটি অংশও প্রচণ্ড মুসলিমবিদ্বেষী, পাকিস্তানবিরোধী এবং হয়তো বাংলাদেশবিরোধীও।

শুনেছি, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের একটি অংশ কমবেশি বাংলাদেশবিদ্বেষী। তাদের ভোটব্যাংক রক্ষা করতেই নাকি মমতা বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দিতে দোনামোনা করছেন। অতীতে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট উপলক্ষে আমরা একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতি কিছু কিছু ভারতীয় মনের সচেতন বা অবচেতন ঘৃণা প্রত্যক্ষ করেছি। এমনিতেও ভারত-পাকিস্তান নির্বিশেষে পূর্বভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতি উত্তর ভারতের আর্য জনগোষ্ঠীর ঘৃণা বা অবজ্ঞার ঐতিহ্য সেই মহাভারতের আমল থেকেই বহমান রয়েছে। সাম্যবাদী ইসলামও এই ঘৃণা নিরাময় করতে সক্ষম হয়নি।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো অজুহাতে সংঘঠিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক অত্যাচার। ‘দাঙ্গা’ নয়, ‘অত্যাচার’ কারণ এক পক্ষ যখন পড়ে পড়ে মার খায়, তাকে ‘দাঙ্গা’ বলা যায় না। সাতচল্লিশের পর থেকেই বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। এর জন্যে হিন্দুবিদ্বেষীরা অবশ্য হিন্দুদেরই দায়ী করে থাকেন। এ অনেকটা বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় ক্রমাগত বর্জ্য ফেলার কারণে মাছগুলো যখন মরে ভেসে ওঠে তখন মাছদেরই তাদের অকালমৃত্যুর জন্যে দায়ী করার মতো।

তাদের কুযুক্তি: ভারতে মুসলমানেরা এত কষ্টে থেকেও দেশত্যাগ করে না। আশির দশকে দাঙ্গার পর শিখরা কি ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিল? বাংলাদেশে হিন্দুরা এত ‘আরামে’ থেকেও পান থেকে চুন খসলে কেন ভারতে পাড়ি দেয়। ভারতবিদ্বেষী ও হিন্দুবিদ্বেষীদের সহজ সমীকরণ: বাংলাদেশের হিন্দুদের দেশপ্রেম নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, দেশপ্রেম যদি নাই থাকে, তবে একাত্তরে এত অত্যাচারিত হয়ে, সর্বস্ব হারিয়ে ভারতে চলে গিয়েও হিন্দুরা স্বাধীন বাংলাদেশের পোড়া ভিটায় ফিরে এসেছিল কেন?

হিন্দুবিদ্বেষ বা মুসলিমবিদ্বেষ যদি রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্যে অপরিহার্য হত, তবে সংখ্যালঘুদের উপর পৌনঃপুনিক অত্যাচার বা ক্রমাগত বৈষম্য না হয় মেনে নেওয়া যেত। দেখা যাক, হিন্দুবিদ্বেষ ও মুসলিমবিদ্বেষের সুবিধাগুলো কী কী?

হিন্দুরা ভারতে চলে গেলে, অথবা মুসলানদের ভারত থেকে তাড়ানো গেলে, তাদের জায়গাজমিগুলো দখল করা যায়। তাদের মেয়েদের ধর্মান্তরিত করে, ধর্ষণ করে, নিজেদের জোয়ানকিও দেখানো যায়। হিন্দু বা মুসলিমবিদ্বেষের কারণে কিছু বদমাস লোকের উপকার তো অবশ্যই হয় (ঘর পুড়ে গেলেও কি কিছু উপকার হয় না? জায়গা সাফ হয়, পোড়া কয়লাও কিছু পাওয়া যায়!) কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই বিদ্বেষ দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদে দেশ ও জাতির কোনো উপকারে আসে না।

কারণ যে কোনো ধরনের ঘৃণা ও বৈষম্য সুস্থ প্রতিযোগিতা ব্যহত করে। সুস্থ প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে অপরিহার্য। বৈষম্যের নীতি অনুসরণ করলে যোগ্য ব্যক্তি, উপযুক্ত লোক কাজ না-ও পেতে পারে। ধরা যাক, হিন্দু বা মুসলমান হওয়ার অজুহাতে আপনি উপযুক্ত কোনো প্রার্থীকে একটা কাজ না দিয়ে কাজটা দিলেন এমন কাউকে, যার দক্ষতা ও আন্তরিকতার অভাব আছে। ক্রমাগত এ ধরনের নীতি অনুসৃত হতে থাকলে পিছিয়ে পড়ে অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র। সব সংখ্যালঘু দেশ ছেড়ে চলে গেলেই যদি দেশের উন্নতি হত, তবে পাকিস্তান বা আফগানিস্তান দিন দিন সর্বক্ষেত্রে এত পশ্চাদপদ হয়ে পড়ত না।

নিরাপত্তার অভাবে হিন্দুরা শুধু নয়, অনেক মুসলমান জনগোষ্ঠী, যেমন ইসমাঈলি বা আহমদিয়ারাও বাংলাদেশ ত্যাগ করছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা ছিল, এখন হয়তো আর খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। এ ধরনের অভিবাসন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যে ইতিবাচক নয়। একটি জনগোষ্ঠী দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অর্থ: তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, কর্মকৌশল এবং পুঁজিও দেশের বাইরে চলে যাওয়া। সবাই সব কাজ পারে না।

মরক্কোর এক সুলতান ইহুদি ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ করে নিজের দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্যবসা করতে। বহু শতক পার হওয়ার পর মরক্কোর স্বাধীনতার প্রাক্কালে সেই ইহুদীদের দেশছাড়া করা হয়েছিল। উগান্ডা থেকে তাড়ানো হয়েছিল ভারতীয় ব্যবসায়ীদের। এর প্রভাব নিশ্চয়ই পড়েছিল মরক্কো এবং উগান্ডার অর্থনীতিতে। ’৪৭ সালে হিন্দু শিক্ষকেরা ব্যাপক হারে দেশত্যাগ করার কুপ্রভাব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার উপর অবশ্যই পড়েছিল। যে কোনো ধরনের ঘৃণা ও বৈষম্য অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকর, সন্দেহ নেই।

ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের মূলোৎপাটন করা আশু প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, আমাদের যুগের কোনো সমস্যাই আর দেশের অভ্যন্তরে সমাধানযোগ্য নেই। নদীর জলবণ্টনের মতো সব সমস্যাই এখন আন্তর্জাতিক। ভারতবিরোধীতা এবং সাম্প্রদায়িকতার মূলোৎপাটনে বহুজাতিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। খুব বেশি সমস্যা না হলে, প্রতিপক্ষ যা চায় তা দিয়ে দিলেই সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যায়। মূল প্রশ্নটা সদিচ্ছার। দিতে পারি, কিন্তু কেন দেব?

দুধ-দেওয়া গোমাতার যদি আদর করা যায়, তবে ডলার-দেওয়া বাঙাল ভ্রাতার সুযোগ-সুবিধার দিকেও ভারতের নজর দেওয়া উচিত

বাইন্যার টুকুর-টাকুর, কামারের এক বাড়ি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ করে, ট্রানজিট দিয়ে ভারতের চোখে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে যা যা করার, বাংলাদেশ তার প্রায় সবটাই করে ফেলেছে, কামারের একাধিক বাড়িতে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে ভারত টুকুর-টাকুর বাড়ি মারছে বটে, কিন্তু এতে দর্শনীয় পরিবর্তন আসতে বহু সময় লেগে যাবে। ভারত যদি উদ্যোগী হয়ে অচিরেই গঙ্গা-তিস্তার জল এবং বাণিজ্যঘাটতি মেটানো– কমপক্ষে এই দুটি কামারের ঘা দেয়, তবে বাংলাদেশে ভারত ও হিন্দুবিরোধী মানসিকতা পূঁজি করে যারা রাজনীতির জল ঘোলা করে ফোকটে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, তাদের আচরণ ও মানসিকতা জনগণের চোখেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতেরই লাভ, কারণ বাংলাদেশের জনগণের আয় যত বাড়বে ততই ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি বিবিধ কারণে চিরদিনের ‘হাতখোলা’ ও ‘দিলখোলা’ বাঙালরা আরও বেশি সংখ্যায় ভারতে গিয়ে গুচ্ছের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আসবে। দুধ-দেওয়া গোমাতার যদি আদর করা যায়, তবে ডলার-দেওয়া বাঙাল ভ্রাতার সুযোগ-সুবিধার দিকেও ভারতের নজর দেওয়া উচিত। স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচ দশকের বাণিজ্য ঘাটতি এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির পর্যটনজনিত আয়ের কথা ভাবলে বাংলাদেশকে যে সহায়তা ভারত দিচ্ছে তা যে কোনো আকলমন্দ ভারতবাসীর কাছেই অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হবে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ’৭১ সালের আগে ভারতের যে সামরিক ব্যয় ছিল, বাংলাদেশের উপস্থিতির কারণে সে অর্থও তো সাশ্রয় হচ্ছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের আরও একটি সুবিধা আছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা ইওরোপ-আমেরিকায় অভিবাসন করলেও, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত হিন্দুরা ভারতকেই তাদের আশ্রয়স্থল মনে করছে। আর শুধু কি হিন্দুরা? দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মুসলমানেরাও অর্থনৈতিক কারণে ভারতে চলে যাচ্ছে। নরসীমা রাও নাকি একবার ভারত সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন:

“আপনি চাইলে ভারতের যে কোনো শহরে আমি আপনার জনসভার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।”

এতে অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু সত্য যে একেবারে নেই– এ কথা বলা যাবে না। সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং টেকসই উন্নয়ন হলে বাংলাদেশিদের ভারতে অভিবাসনের প্রবণতা হ্রাস পাবে। পূর্ব ভারতে ভোটের অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশের বহিরাগত নিয়ে যে নোংরা রাজনীতি হয়, সেটারও অবসান ঘটবে।

নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে। ভারতকেও ঠিকঠাকমতো বুঝতে হবে, বাংলাদেশ আসলে কী চায়। ভারত যদি নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘বড় ভাই’ মনে করে, তবে তার জানা উচিত, উত্তরের ভাইটির মতো বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লাগে না বটে, কিন্তু বিনা প্রশ্নে সব কিছু মেনে নেওয়ার মতো এমন কিছু ভ্যাবলাও সে নয়।

রামায়ণের সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ভারতকে ভাতৃস্নেহের বিষয়ে সবক দেওয়া বাহুল্য। বড় ভাই হতে হলে শ্রীরামের মতো ধৈর্য্য, ন্যায়বিচার আর কর্তব্যপালনের মানসিকতা থাকা দরকার। ছোট ভাইয়ের হাতে এক-দুইটা মুখরোচক কিন্তু অস্বাস্থ্যকর চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেই বড় ভাইয়ের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না।

ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের রসুইঘরে এমন খাবার রান্না করা উচিত, যা বাঙালির জিহ্বায় যুগপৎ রুচিকর এবং পরিণামে স্বাস্থ্যকর প্রমাণিত হবে।

Reply