আজ থেকে সাত বছর আগে এই দিনে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেছিল বিজেপি, কেমন ছিল তাঁর জয়যাত্রা? জেনে নিন ।

আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর নাম ঘোষণা করেছিল বিজেপি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য এই ঘোষণা ছিল গেরুয়া শিবিরের চমকে দিয়েছিল সেই সময়ের তাবড় তাবড় রাজনীতির ব্যক্তিত্বদের। তৎকালীন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের এই ঘোষণার সময় পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

কে হবে ২০১৪ সালে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী এই নিয়ে চলেছিল অনেক তর্ক বিতর্ক।‌কেউ বলেছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ লালকৃষ্ণ আদবাণীর নাম।কারণ আবার দাবি ছিল সুষমা স্বরাজ বা অরুণ জেটলির স্বপক্ষে। মোদীর নাম যে ঘোষণা করা হতে পারে এ কথা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি কেউ কারণ মিডিয়া মোদীকে দাগিয়ে দিয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি হিসাবে। কিন্তু মিডিয়া কখনো বলেনি যে, তার ১২ বছরের মুখ্যমন্ত্রীর সময়ে বাকি সময়টা গুজরাট শান্তিপূর্ণ ছিল।

সেই সময় রানা আয়ুব ও রাজদীপ সরদেশাই মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য রীতিমতো তামাশা করেছিল। আরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিষেককে বেশ হালকা ভাবে নিয়েছিল। এমনকি মোদীর মার্কিন ভিসার স্থিতি নিয়েও তারা ব্যঙ্গ করেছিল।সবরমতী তীরের এই লোকটি যে একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন এই কথা কেউ ভাবেন নি। সেইসময় গোটা ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম তার বিরুদ্ধে ছিল। বিরোধী নেতারা তাঁকে ‘মওউত কা সওদাগর’ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন।এমনকি বিজেপির অভ্যন্তরেও সবাই এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না।

২০১৩ সালের জুন মাসে যখন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর নাম বারবার উঠে আসছে বিভিন্ন সভায় তখন জেডিইউ-এর নীতীশ কুমার এক বছরের পুরনো এনডিএ জোট ভেঙে বেরিয়ে আসেন। ২০১০ সালে নীতীশ কুমার মোদী সহ বিজেপি নেতাদের জন্য পূর্ব নির্ধারিত ডিনার বাতিল করেছিলেন। দু’বছর আগে, ২০০৮ সালে, তিনি বিহারকে বন্যার ত্রাণ হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে গুজরাট সরকারের দেওয়া পাঁচ কোটি টাকা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নরেন্দ্র মোদী ‘ভাইব্রেন্ট গুজরাট’ দ্বিবার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন শুরু করেছিলেন। একজন প্রবীণ সাংবাদিক বলেছিলেন যে, ২০০২ সালের দাঙ্গার ঠিক পরে মোদী গুজরাটের পক্ষে উপলব্ধি পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি গুজরাটের কথা লোকের চিন্তা করলে যেন কোনো সদর্থক চিন্তা করে তার ব্যবস্থা করতে শুরু করেছিলেন।

তার আগে মোদী বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের ডেকেছিলেন এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা দিয়েছিলেন। গুজরাট সমাচার সম্পাদক, শ্রেয়াংশ শাহ, যার আঞ্চলিক পত্রিকা ২০০২ এর দাঙ্গার সময় বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরেছিল তিনি বলেছিলেন যে, অমিত শাহ এই উপস্থাপনার মাঝামাঝি বাইরে গিয়েছিলেন, আপাতদৃষ্টিতে তিনি প্রভাবিত ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদী তাঁকে ফিরে আসতে বলেন। কিন্তু শাহ সেই সাহস করলেন না।এরপরে মোদী সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁর ব্যাপারে মিডিয়া কী বলছে সেই নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাবেন না। তিনি নিজের কাজ করে যাবেন।

পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত হয়েছিল যখন হিসাব অনুযায়ী লোকসভা নির্বাচন শেষ হবে না। তবুও নরেন্দ্র মোদী এই সুযোগটাকে কাজে লাগালেন। তিনি সবুজ শক্তি, ক্লিন টেক, শিক্ষা, কৃষি, তথ্য প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ‘ভাইব্রেন্ট গুজরাট প্রাক-ইভেন্ট সামিটস’-এর একটি সিরিজ সাজিয়েছিলেন এবং সেই প্ল্যাটফর্মকে দেশবাসীর কাছে তাঁর মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে যারা ২০০৩ সালে এই শীর্ষ সম্মেলন খারিজ করে দিয়েছিল তারাই এই খবর তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করছিল।

২০১৪ সালে জনগণ কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। তবে তারা কি বিজেপিকে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিল? লোকেরা কি মোদীকে ভোট দেওয়ার জন্য ২০০২ সালের দাঙ্গার ঘটনাবলী ও বিবরণ উপেক্ষা করতে আগ্রহী ছিল? যখন দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসাবে কোনও ‘যুক্তিবাদী’ নেতা বেছে নেওয়া বিজেপির পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, সেখানে কি কোনও ‘ঝুলন্ত সংসদ’ হওয়া উচিত এবং পাঁচ বছরের একটি স্থিতিশীল সরকারের জন্য বিজেপির মিত্রদের উপর নির্ভর করতে হবে এরকমটাই ভাবা উচিত ছিল?

কিন্তু মোদীর শারীরিক ভাষা অন্য কথা বলছিল নিজের জিতবেন তা নিয়ে যেন তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন। শুধু একবার নয়। তিনি কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই করেননি, ২০১৯ সালে যখন তিনি আরও শক্তিশালী ম্যান্ডেট নিয়ে ফিরে এসেছিলেন তখন তিনি একটি নতুন ইতিহাস লিখেছিলেন।

Reply