মহাধুমধামে হাওড়া শহরে হল দেবীর বোধন

আজ মহাষষ্ঠী। কলকাতার বহু বনেদিবাড়ির মতো হাওড়া শহরাঞ্চলে রয়েছে বহু বনেদি বাড়ি। সেখানেও শুরু হয়েছে মায়ের বোধন। কালের অমোঘ নিয়মে বিস্মৃতির অতল গভীরে আজ হারিয়ে গেছে অনেক কিছুই। আজ হয়তো নেই রাজতন্ত্র কিংবা জমিদারীপ্রথা। আজ হয়তো হারিয়ে গেছে সেইসব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-রীতিনীতি-সাবেকী। বাংলার বুকে ছড়িয়ে আছে কত বনেদি বাড়ির ইতিহাস। কোথাও রাজবাড়ির পুজো, আবার কোথাও জমিদার বাড়ির পুজো। পুরনো সেই সব বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু জনশ্রুতি,গল্পগাথা। সময়ের সাথে সাথে বনেদি বাড়ির পুজোর জৌলুস কমলেও, সাবেকিয়ানা এখনও অটুট ইতিহাসের গন্ধমাখা শতাব্দী প্রাচীন এই সব পুজোয়।

১)সদর হাওড়ার দুর্গোৎসব প্রসঙ্গে বলতে হলে সর্বপ্রথমই আসে ‘আন্দুল রাজবাড়ী’-র পুজোর কথা।জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীন দুর্গোৎসব।১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে জমিদার রামলোচন রায় ইংরেজ বড়োলাট ক্লাইভের পরামর্শে এই পূজার সূচনা করেন।জানা যায় যে,প্রথমবর্ষের পুজোয় উপস্থিত ছিলেন লর্ড ক্লাইভ স্বয়ং।তিনি দেবীর পাদপদ্মে ১০৮ টি পদ্ম ও ১ হাজার টাকা প্রণামী নিবেদন করেন।

২)আন্দুলের দত্তচৌধুরী বাড়ির পুজোও প্রায় কয়েকশো বছরের প্রাচীন। বনেদীয়ানা হ্রাসের সাথে সাথে পূজাপার্বনের রীতিনীতিতেও আজকাল ভাটা পড়েছে প্রাচীন পুজোগুলিতে।কিন্ত,এদিক থেকে এই বংশের পুজো আজও তার ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে বহন করে চলেছে সমানভাবে।বর্তমানে চালগুঁড়িতে নির্মিত কলাগাছের খোলে ‘শত্রুমূর্তি’ বলি দেওয়া হয়।এখানে পুজো হয় ‘বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ’ মতে৷বোধন হয় পুজোর ঠিক ১২ দিন আগে অর্থাৎ কৃষ্ণনবমী তিথিতে আর শেষ হয় দুর্গানবমী তিথিতে ৷ পুজো বোধনকালে পরিবারের অবিবাহিতা মেয়েরা হাতে শাঁখা পরেন ৷

৩)এরপরেই এসে যায় বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার কথা।বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত মানুষ ছুটে আসেন যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত এই দুর্গাপূজায় যোগদানের উদ্দেশ্যে।এইপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তথা আকর্ষণ অষ্টমীতিথিতে ‘কুমারী পূজা’।স্বামীজি মানুষের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন পরম ঈশ্বরকে।তাই তিনি ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র সাথে সাথে সমাজের মাতৃরূপা নারীশক্তির আরাধনা করতে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম কুমারী পূজা চালু করেছিলেন।প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি,স্বামীজি সর্বপ্রথম ‘কুমারী’ হিসাবে পূজা করেছিলেন তাঁর প্রিয় বন্ধু তথা আমতার ভূমিপুত্র মন্মথনাথ ভট্টাচার্যের কন্যাকে।যদিও এটি বেলুড়ে না মাদ্রাজে সেটা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে।

৪)আন্দুলের কুন্ডু চৌধুরী বাড়ির পুজো জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব হিসাবে বিবেচিত হয়।তৎকালীন সময়ে জমিদার ও ব্যাবসায়ীদের অন্যতম ব্যবহার্য উপাদান ছিল ‘নৌকা’।মৃন্ময়ী মূর্তির আরাধনার সাথে ‘নৌকা’-কে পুজো করা হত।এই রীতি আজও স্বমহিমায় অটুট রয়েছে।

৫)দেশজুড়ে স্বদেশী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।বাংলা তখন জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার।সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে হাওড়ার কিছু যুবক স্থানীয় ছাত্র-যুবকে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তুললেন ‘হাওড়া সেবা সংঘ’।নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পরামর্শ অনুযায়ী বাগবাজার সর্বজনীনের পুজোয় প্রাণিত হয়ে হরেন্দ্র নাথ ঘোষ সংঘের সদস্যদের নিয়ে ১৯২৭ সালে চালু করলেন জেলার অন্যতম প্রাচীন সর্বজনীন দুর্গোৎসব।স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪২-৪৪ সালে এই সংস্থাকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে।যার ফলে ওই তিনবছর পুজো বন্ধ থাকে।শতবর্ষের দ্বারে উপনীত এই পুজোয় নবমী তিথিতে দু’ঘন্টা ধরে মহারতি অনুষ্ঠিত হয় যা এই প্রাচীন পুজোর অন্যতম মূল আকর্ষণ।উল্লেখ্য,কদমতলার এই দুর্গোৎসব জেলার প্রাচীনতম সর্বজনীন দুর্গোৎসব।

৬)১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো শুরু হয় রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর হাত ধরে।এই পরিবারের কুলদেবতা হলেন ‘ব্যাতাইচন্ডী’।ব্যাতাইচন্ডীর মুকুট খুলে এনে মা দুর্গার মাথায় পরানো হয়।
৭)হাওড়া সদরের প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে শিবপুরের ভট্টাচার্য পরিবারের পুজো অন্যতম।শিবপুরের প্রাচীন জমিদার রায়চৌধুরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামব্রহ্ম।তিনি শিবপুর,সলপ,নিবড়া,বাঁকড়া,বেতড়ের ন্যায় পৈতৃক জমিদারির তেরোটি গ্রাম নিজের ভাগে পেয়ে শিবপুরে বসতি স্থাপন করেন।রায়চৌধুরী বংশের পূজারি ছিলেন এই ভট্টাচার্য পরিবারের পুরোহিতরা।তাঁরা রায়চৌধুরীদের সাথে একই সময়ে শিবপুরে বসতি স্থাপন করেন।ভট্টাচার্য বাড়ি সংলগ্ন ঠাকুরঘরে প্রতিবছর এই প্রাচীন দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

৮)সালকিয়ার ‘আটা’ পরিবারের পুজো প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন।লোহা ব্যবসায়ী নফরচন্দ্র আটার হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। ৯)সালকিয়ার বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোও জেলার অন্যতম প্রাচীন। ১০)বালির ব্যানার্জী বাড়ির দুর্গোৎসব।এই পুজোয় বিশ্বের পবিত্র নদীগুলির জল ব্যবহৃত হয়। ১১)শিবপুরের বি.কে পাল বাড়ির পুজো প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন।মহানবমীতে এই পুজোয় মোষবলির প্রচলন আছে। ১২)সালকিয়ার ঘোষ বাড়ির পুজোর সূচনা ঘটেছিল ১৮০১ সালে।মাত্র ১৪ বছর বয়সে মাধবচন্দ্র ঘোষ নামে জনৈক যুবক এই পুজোর প্রচলন করেন। ১৩)আন্দুলের ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গোৎসবও বহুপ্রাচীন।১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার সূচনা ঘটে।

১৪)প্রখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ির পুজো প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন।এই বনেদী পরিবারের পুজো শুরু হয়েছিল জমিদার রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে।পুলক বাবুর হাত ধরে সালকিয়ার প্রাচীন এই দুর্গোৎসব এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছায়।পুজোয় বসত গানের আসর।মান্না দে,উত্তম কুমারের ন্যায় সংস্কৃতি জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বরা আসতেন পুজোয় আসর জমাতে।প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে ছাচি কুমড়ো,পান্তা ভাত,মুসুর ডাল,ল্যাটা মাছ পোড়া ভোগ দেওয়া হয় মায়ের কাছে যা এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

Reply