Tuesday , September 21 2021
Breaking News

মুকুলের ছাড়ার ধাক্কায় বিজেপি মন্ত্রিসভায় রদবদল করবে, তাতে বেআব্রু চেহারা ঢাকবে না

সুমন ভট্টাচার্য: কৈশোর থেকে ক্রিকেটের ভক্ত মুকুল রায় ঘনিষ্ট মহলে প্রায়সই বলে থাকেন, ‘ক্রিজে টিকে থাকলে রান আসবেই’। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবির পরে শুক্রবার তাঁর দলবদল আবার প্রমাণ করে দিয়ে গেল, ক্রিকেটের শিক্ষা তিনি জীবনে এবং রাজনীতিতে বার বার প্রয়োগ করতে জানেন।

শুক্রবারের মোক্ষম চালে মুকুল রায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে যতটা বিড়ম্বনায় ফেললেন, প্রায় ততটাই নিশ্চিত করে গেলেন নিজের পুত্র শুভ্রাংশু রায় এর রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে। একদা তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ ভালো করেই জানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের পরবর্তী প্রজন্মের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুভ্রাংশু রায়কে কতটা বুকে টেনে নিয়েছেন। মুকুল রায় তৃণমূল সুপ্রিমোকে শুক্রবার যে রাজনৈতিক অস্র্ে উপহার দিয়েছেন, তার প্রতিদানে তিনি নিজের ছেলের তৃণমূলে অবস্থানকে পোক্ত করে দিয়ে গেলেন।

মুকুল রায়ের বিজেপি ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে কি কি অস্ত্র তুলে দিল? পয়লা নম্বর অবশ্যই তৃণমূল নেত্রী আরও জোরের সঙ্গে এবার থেকে বলতে পারবেন বিজেপি করাটা বাঙালির পক্ষে কতটা কঠিন এবং কেন সেই দলে কেউ টিকে থাকতে পারেন না। দ্বিতীয়ত যেটা এতদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলে আসছিলেন, কেন্দ্র্রের শাসক দল সিবিআই-ইডির ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলগুলিকে ভাঙায় এবং রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করে, তা শুক্রবার মান্যতা পেয়ে গেল।

এই দিন বিকেলে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে যখনই কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখানোর প্রসঙ্গটি উঠেছে, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তিটি মনে রাখার মতো। ‘মুকুল ওদের দলে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল, ভালো ছিল না।’ এইটুকুর মধ্যে দিয়ে তৃণমূল নেত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলেই পৌঁছে গিয়েছে। বার্তাটি খুব পরিষ্কার, অমিত শাহ সিবিআই-ইডি দিয়ে যতই ভয় দেখান, বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের সেই আতঙ্কের আবহ থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসে গিয়েছে।

বিজেপিতে মুকুল রায় ছিলেন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। অর্থাৎ ছত্রিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রমন সিং বা রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব কৃষ্ণনগর দক্ষিণের এই বিধায়ককে দেওয়া হয়েছিল। এহেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা কাউকে কিছু না জানিয়ে সপুত্র তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে কোনও বহিস্কারের নোটিশ বা কোনও ঘোষণা নেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির প্রতিটি বলকে ‘বাপি বাড়ি যা’র ঢঙে বাউন্ডারির বাইরে ফেলে দিচ্ছেন, তখন চানক্য অমিত শাহ বা বাংলার জামাই জে পি নাড্ডা কোথায়? দিল্লির খবর বলছে, নাড্ডা এবং শাহ শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন মন্ত্রীসভার সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে। মুকুল রায়ের ধাক্কা হয়তো বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বাধ্য করবে পনেরো মাস বাদে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেসত্যাগী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে। রাজনৈতিক সূত্র বলছে, নরেন্দ্র মোদী নিজের মন্ত্রীসভা ঢেলে সাজানোর কথা ভাবছেন।

ইতিহাস এবং রাজনীতির বাস্তব থেকে দূরে থাকা আরএসএস এবং বিজেপি নেতৃত্ব আসলে ভারতের রাজনৈতিক অতীতটাকে ভুলে গিয়েছে। মনে থাকলে জানতো মহাত্মা গান্ধী কেন ‘ক্রিপস মিশন’কে ‘একটি ফেল করে যাওয়া ব্যাঙ্কের উপর সই করে দেওয়া চেক’ বলেছেন। বিজেপির সরকার কোভিড মোকাবিলায় যে ব্যর্থতা দেখিয়েছে, দেশের আমজনতাকে যে অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তাতে এখন কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থাও অনেকটাই ‘ক্রিপস মিশন’ এর মতোই।

পুরোটাই নির্ভর করে আছে আগামী বছরে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের উপর, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের ফলাফলের উপর। যোগী আদিত্যনাথের সরকারের এখনও পর্যন্ত যা পারফরমেন্স বা কৃষক বিক্ষোভের জেরে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তাতে উত্তরপ্রদেশ গেরুয়া শিবিরের জন্য কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। দেশের সবথেকে বেশি জনসংখ্যার রাজ্য, যে রাজ্য লোকসভায় ৮০ জন সদস্যও পাঠায়, সেই উত্তরপ্রদেশ হাতছাড়া হলে বিজেপির জন্য দিল্লি ‘দূর অস্ত’ হয়ে যাবে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় রদবদলই হোক বা নতুন কোনও প্রকল্প ঘোষণা, আসল কথা হচ্ছে দেশের মানুষ বিজেপি সরকারের কাছ থেকে পারফরমেন্স চাই। করোনা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা, দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, রোজ বাড়তে থাকা পেট্রোল-ডিজেলের দাম কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঠিক সেই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায়কে দলে ফিরিয়ে এনে, বিজেপির সংগঠনের কঙ্কালসার চেহারাটাকে আরও বেআব্রু করে দিলেন।

About A..

Check Also

ফাইল চিত্র।

Dilip Ghosh on Babul Supriyo: মন্ত্রী হতে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁরা কোথায়? দিলীপের বাবুল-কটাক্ষের লক্ষ্য দিল্লি?

বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়র তৃণমূলে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে কার্যত দলের উপরতলার দিকে আঙুল তুললেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *