Tuesday , September 21 2021
Breaking News
The situation in Afghanistan worrisome for Modi Govt | Sangbad Pratidin

তালিবানের উত্থান থেকে বিরোধী ঐক্যে চাপে কেন্দ্রীয় সরকার, তবুও বিলাসিতা দেখাতে পারেন মোদি

তালিবানি জাগরণ, জাত-গণনার সম্মিলিত দাবি অথবা বিরোধী ঐক্যের প্রয়াস- তিনটিই কম-বেশি চাপে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করার বিলাসিতা নরেন্দ্র মোদি দেখাতেই পারেন। পরবর্তী লোকসভা ভোটে বিরোধীদের ভবিতব্য হতে পারে সুকুমার রায়ের ‘ছায়াবাজি’-র দ্বিতীয় লাইন– ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা! লিখছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ক সপ্তাহের মধ্যে কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল। স্বাধীনতা দিবসের দিন তালিবানরা কাবুল দখল করল। ভূ-রাজনীতি তো বটেই, কূটনীতিতেও উথালপাথাল ঘটিয়ে সেই ঘটনা সবাইকে এমন সব প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে- যার উত্তর অজানা। ভারতকেও তা ফেলে দিয়েছে গভীর গহ্বরে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে! পাঁচদিনের মাথায় কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর ডাকা বৈঠকে যোগ দিলেন দেশের ১৯টি দলের নেতারা। মাত্র ক’দিন আগে এই সোনিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে সরকার-বিরোধিতার খসড়ায় সই করেছিল ১৪টি দল। দিনকয়েকের ব্যবধানে তার বহর বাড়ল, জোট পোক্ত করার তাগিদে। বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাব কার্যকর হলে বহর আরও বাড়ার সম্ভাবনা।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে সোমবার। জাতভিত্তিক জনগণনার দাবিতে বিহারের দশ দলের এগারোজন নেতা দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এমন জোট অভিনব। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজ্যে তাঁর চ্যালেঞ্জার ‘রাষ্ট্রীয় জনতা দল’-এর নেতা তেজস্বী যাদব, কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্য দলের তাবড় নেতা। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা বলেছেন, দেশে গরু-মোষ অথবা গাছপালার গণনা যদি চলতে পারে, তাহলে মানুষের জাত জানতে অসুবিধা কোথায়?

তেজস্বীর যুক্তি, জনগণনার সময় মানুষের ধর্ম জানতে চাওয়া হয়। তফসিলি জাতি, উপজাতি অথবা অনগ্রসর কি না জানতে চাওয়া হয়। সেখানে বাড়তি একটা ঘর দরকার, যেখানে জাতের কথা উল্লেখ করতে হবে। বাড়তি এক পয়সা খরচ নেই এই কাজে!

এদেশে যেখানে কিছুই প্রায় সর্বসম্মতভাবে হয় না, সেখানে এই একটা বিষয়ে দেখা গেল জনতা দল, বিজেপি, কংগ্রেস, আরজেডি, সিপিআই, সিপিএম, সিপিআই (এম এল), ভিআইপি, মিম, হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা- সব দল এককাট্টা। উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্য, যেখানে অমুকের সঙ্গে তমুকের বাক্যালাপ নেই, সেখানেও জাত-গণনায় সব্বার এক সুর! মমতাও বলেছেন, সবাই একমত হলে তিনিও রাজি।

স্বাধীন ভারতে এই দাবি এবারই প্রথম এমন সমস্বরে উঠল। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ১৯৩১ সালে শেষবার জাত-গণনার রিপোর্ট পেশ হয়েছিল। দশ বছর পরের আদমশুমারে জাত-গণনা হলেও রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। ২০১০ সালে লোকসভায় জোরাল সওয়াল করেছিলেন বিজেপির প্রয়াত গোপীনাথ মুণ্ডে। ২০১১-তে তাই জাত-গণনা হয়। রিপোর্টও দেওয়া হয় সামাজিক ন্যায়মন্ত্রককে। ২০১৬ সালে মোদি সেই রিপোর্ট খতিয়ে দেখতে একটা কমিটি গড়েন। ব্যস, তারপর আর কিছু শোনা যায়নি। জাত-গণনায় এখনও তাই তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর গোষ্ঠী বা ‘ওবিসি’-র বাইরে আর কিছু নেই। ওবিসির হাজারটা বিন্যাস, রাজ্যে রাজ্যে যা আবার আলাদা, গণনায় আসে না। এবার সেটাই জোরাল দাবি। কে জানে, কোনও একদিন হয়তো এটাই দেশি রাজনীতির বড় হাতিয়ার হবে।

তিন ঘটনার মধ্যে কম-বেশি মিল এক জায়গায়- চাপ। সরকারের চাপ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ অবশ্যই আফগানিস্তান। সরকার এতটাই দিশাহারা যে, মেঘ না-চাইতে জলের মতো বিনা দাবিতেই সর্বদল বৈঠক ডেকেছেন মোদি। বিদেশমন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন বিরোধীদের ‘ব্রিফ’ করার।

বিরোধীদের জোট-উদ্যোগের চাপ সেই তুলনায় এখনও কম। লোকসভা ভোটের আগে অনেকগুলো বিধানসভা ভোটের সামাল প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হবে। জাত-গণনার দাবির চাপ অবশ্য সবচেয়ে কম। বিজেপির অভ্যন্তরে এই দাবি মাথাচাড়া দিলেও এখনই কেউ এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিপাকে ফেলতে চায় না। এর একটা সম্ভাব্য কারণ, মোদি নিজে ‘ওবিসি’। বিজেপির ‘কোর নেতৃত্ব’ জাত-গণনার ঘোর বিরোধী। কারণ তাতে সংঘ ও দল পরিচালনায় বর্ণহিন্দু রমরমা শুধু কমবে না, সংরক্ষণ-সম্পর্কিত ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ এমনভাবে খুলে যাবে যে, সামলানো কঠিন। আগামী দিনে আরও কিছু নতুন চাপে প্রধানমন্ত্রী জেরবার হতে পারেন। পেগাসাস, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব বা অন্য কিছু। সেসব পরের কথা। কেননা, ২০২৪ বেশ দূরে।
তিনটি ঘটনার মধ্যে জাত-গণনার সম্মিলিত দাবি সদ্যোজাত। সামলানোর সময় আছে বিস্তর। তালিবানি উত্থান সরকারকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করলেও বিরোধীরা এমন কিছু করবে না, যাতে দেশ আরও বিপন্ন হয় ও পাকিস্তান বাড়তি সুবিধা পায়। তবে, বাড়াবাড়ি কিছু হলে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে মোদি তাঁর আসন আরও পোক্ত করতে পারেন।

বিভাজন ও বিদ্বেষের চেনা রাজনীতির আগুনে তালিবানি ও পাকিস্তানি ঘি হবে বাড়তি ইন্ধন। ভোট-আবহে উগ্র হিন্দুত্ববাদের সহায়কও। বাকি থাকে শুধু একটিই ঘটনা। বিরোধীদের একজোট হওয়ার উদ্যোগ। কিন্তু সেটাও মোদিকে টলানোর ক্ষমতা রাখে কি? সংশয়ের কারণ, সোনিয়ার ডাকে যাঁরা সাড়া দিয়েছেন, তাঁদের ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে, যাঁরা সাড়া দেননি। ডাকা হয়নি ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার তিন শাসকদল বিজেডি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস ও টিআরএস-কে। চিঠি দেওয়া হয়নি দিল্লির আম আদমি পার্টি, পাঞ্জাবের অকালি দল ও উত্তরপ্রদেশের বিএসপি-কে। এসপি-কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অখিলেশ তাঁর পাঠানো বার্তায় না-আসার তুচ্ছ একটা কারণ দেখিয়েছেন। মমতা এইসব অনুপস্থিতির উল্লেখ করে বলেন, সবাইকে জোটে শামিল করা না গেলে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্য সার্বিক হবে না। তা না হলে মোদিকে সরানোও কঠিন।

ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি মোদি-শাসনেরও জাদুদণ্ড। সংঘের ‘সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ’ নীতির সার্থক প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ যে-চারটি দলকে বিজেপি ট্যাঁকে গুঁজে রেখেছে, ভোট-বাজারে তো বটেই, সংসদীয় রাজনীতিতেও তারাই সরকারের ‘প্রকৃত বন্ধু’। ভয় বা ভক্তি- সঙ্গদানের কারণ যা-ই হোক, এই দলগুলোর মন না-বদলালে ভোট-ভবিতব্য সুকুমার রায়ের ‘ছায়াবাজি’-র দ্বিতীয় লাইন- ‘ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা!’

ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার মোট লোকসভা আসন ৬৩। গত ভোটে কংগ্রেসের ভাগ্যে জুটেছিল সাকুল্যে ৪। ওড়িশায় বিজেডি-র প্রাপ্য ভোটের হার ছিল ৪২.৮ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর কংগ্রেসের ৪৯.১৫ এবং তেলেঙ্গানায় টিআরএস-এর ৪১.৩ শতাংশ। জোট সমীকরণ না বদলালে এই ৬৩ আসন মোদির দিকেই ঢলে থাকবে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মোট আসন ২৫। আঞ্চলিক চরিত্র কেন্দ্রের কোলে শরীর এলিয়ে রাজত্ব করা। দুর্বল কংগ্রেসকে এই অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেস আরও দুর্বল করছে। তাতে মোদির পোয়াবারো। ৬৩‍+২৫=৮৮টি আসন প্রতিরোধহীন হয়ে গেলে মোদির লড়াইও সহজ হয়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হবে উত্তপ্রদেশে মায়াবতীর অদৃশ্য গাঁটছড়া। ভূ-ভারতে বিএসপি-ই সম্ভবত একমাত্র দল, যাদের ভোট শতাংশে হেরফের ঘটে নামমাত্র। প্রলয় ঘটে গেলেও উত্তরপ্রদেশে ২০ শতাংশের মতো ভোট এই নেত্রীর বাঁধা। ২০১৯ সালেও তারা পেয়েছিল ১৯.৪৩ শতাংশ ভোট ও ১০টি আসন। চার রাজ্যে চার দলের রাজনীতির বিচিত্র রসায়ন ও পাটিগণিতের নিট নির্যাস- ১০০ আসন। মোদি-মাহাত্মে্যর রহস্য উদ্‌ঘাটন ‘জলবৎতরলং’।

দেশি জনতার ‘মুড’ বুঝতে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ বছরে দু’বার সমীক্ষা চালাচ্ছে। আপাতত সেটাই বিরোধী ভরসার ধ্রুবতারা। গত বছরের আগস্টে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ছিল ৬৬ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা কমে হয় ৩৮। আগস্টে তা দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে। পতনের হার মোদির পক্ষে চিন্তাজনক হলেও, জনপ্রিয়তায় এখনও তিনি রাহুল গান্ধীর তুলনায় আড়াই গুণ ও মমতার চেয়ে তিন গুণ বেশি! তালিবানি জাগরণ, জাত-গণনার দাবি অথবা বিরোধী ঐক্যকে উপেক্ষা করার বিলাসিতা যদি কারও থেকে থাকে, তো তাঁরই! তবু সবার আগে কোমর কিন্তু তিনিই কষে বাঁধছেন।

সূত্রঃ সংবাদ প্রতিদিন

About A..

Check Also

62 lacs farmers in WB get 'Krishak Bandhu' allowance within 15 days | Sangbad Pratidin

‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পে বড় সাফল্য রাজ্যের, মাত্র ১৫ দিনে ভাতা পেলেন ৬২ লক্ষ চাষি

মলয় কুণ্ডু: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ‘কৃষকবন্ধু’ (Krishak Bandhu) প্রকল্পের টাকা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করবেন। তিনি প্রতিশ্রুতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *